বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:২৬ অপরাহ্ন
যখন মানুষ পশুকে হার মানায়, তখনই শুরু হয় ধ্বংস!
অনলাইন ডেস্ক
মহাবিশ্বের একমাত্র অদ্বিতীয় অধিপতি মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে কোটি কোটি শুকরিয়া, যিনি আমাদের মানুষরূপে সৃষ্টি করেছেন—আলহামদুলিল্লাহ। আমরা সৌভাগ্যবান, কারণ আমরা মানুষ হয়ে জন্মেছি। পবিত্র কোরআনুল কারিমে মহান আল্লাহ বলেন—“আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দিয়েছি, আমি তাদের স্থলে ও জলে চলার বাহন দিয়েছি, উত্তম জীবিকা দান করেছি এবং বহু সৃষ্টির উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।” (বনি ইসরাইল, আয়াত ৭০)
আল্লাহ তাআলা মানুষকে এমন বৈশিষ্ট্যে ভূষিত করেছেন, যা অন্য কোনো সৃষ্টির নেই—সুশ্রী চেহারা, সুষম গঠন, প্রাকৃতিক ভারসাম্য, বুদ্ধিমত্তা ও চেতনার দীপ্তি। মানুষকে তিনি এমন সক্ষমতা দিয়েছেন, যার মাধ্যমে তারা নানা শিল্প-দ্রব্য তৈরি করে জীবনকে সহজ করে তোলে। পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে শুরু করে বাসস্থান, চলাচল—সবই মানুষের বুদ্ধির ফসল। মানুষের বাকশক্তি, ভাব বিনিময়ের অদ্বিতীয় ক্ষমতা এবং লেখা-পাঠের গোপন শিল্প—সবই একান্তভাবে মানবিক বৈশিষ্ট্য।
মানুষ আঙুল দিয়ে খেতে পারে—এটিও এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। অন্য সব জীব মুখে খাবার তোলে। সুস্বাদু খাবার তৈরি করার নৈপুণ্যও একমাত্র মানুষের। কিন্তু মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব আসলেই বিবেক, বুদ্ধি ও চেতনায় নিহিত।
যারা শুধু জন্মগত মানুষ, কিন্তু মানবিক গুণাবলি বিসর্জন দিয়েছে—তারা ফেরেশতার চেয়েও উত্তম হওয়ার যোগ্য নয়, বরং পশুর চেয়েও অধম। কোরআনে বলা হয়েছে—“আমি বহু জিন ও মানুষকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি। তাদের অন্তর আছে, তারা বোঝে না; চোখ আছে, দেখে না; কান আছে, শোনে না—তারা চতুষ্পদ জন্তুর মতো, বরং আরও নিকৃষ্ট। তারা গাফেল।” (আরাফ, আয়াত ১৭৯)
এটা দেখে অবাক হতে হয়—একজন মানুষ হয়ে কিভাবে আরেকজন মানুষকে হত্যা করতে পারে! একটি হত্যাকাণ্ড যখন এখনো বিচার পায়নি, তখনই ঘটে আরেকটি নির্মম হত্যাকাণ্ড। গণমাধ্যমে যখন প্রতিবেদন আসে, হৃদয় কেঁপে ওঠে—কিন্তু অপরাধীরা থাকে বেপরোয়া, যেন আইন-কানুন তাদের জন্য কিছুই নয়।
এমনকি গর্ভের শিশু পর্যন্ত আজ নিরাপদ নয়। দশটি কুকুর একটি কুকুরকে কামড়ে মারলে বোঝা যায়—ওরা হিংস্র, পশু। কিন্তু দশজন মানুষ মিলে একজন মানুষকে হত্যা করলে—তাতে মানবতার অপমৃত্যু হয়। মানুষ তো সহানুভূতির প্রতীক! এমন হিংস্রতা যারা চালায়, তারা কি মানুষ?
সম্প্রতি মিটফোর্ডে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ড এবং ময়মনসিংহে মা ও দুই সন্তানের নৃশংস হত্যাকাণ্ড মানুষের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে। কোরআনের ভাষায়—“তারা পশুর চেয়েও অধম।”
কোরআনে আল্লাহ বলেন—“যে ব্যক্তি কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করল, সে যেন গোটা মানবজাতিকে হত্যা করল। আর যে কাউকে বাঁচাল, সে যেন গোটা মানবজাতিকে বাঁচাল।” (মায়েদা, আয়াত ৩২)
আজ সমাজে যত অজান্তে জুলুম ঘটে, সবই কিয়ামতের দিন ঘোর অন্ধকারে রূপ নেবে। আল্লাহ বলেন—“সেদিন জালেমদের ওজর কোনো কাজে আসবে না, তাদের জন্য থাকবে অভিশাপ এবং জঘন্য গৃহ।” (মুমিন, আয়াত ৫২) অন্যত্র বলেন—“জালিমদের কোনো বন্ধু থাকবে না, এমনকি কোনো সুপারিশকারীও না।” (মুমিন, আয়াত ১৮)
রাসূল (সা.) বলেন—“জুলুম কিয়ামতের দিন অন্ধকার হয়ে উঠবে।” (বুখারি: ২৩৮৩)
আল্লাহ বলেন—“দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তান হত্যা করো না, আমিই তোমাদের ও তাদের রিজিকদাতা। অশ্লীলতার ধারে-কাছে যেও না, এবং যাকে হত্যা করা হারাম করা হয়েছে তাকে অন্যায়ভাবে হত্যা কোরো না।” (আনআম, আয়াত ১৫১)
শুধুমাত্র তিনটি ক্ষেত্রে মানুষ হত্যা বৈধ:
১. বিবাহিত হয়েও ব্যভিচারে লিপ্ত হলে।
২. কেউ কাউকে হত্যা করলে কিসাস হিসেবে।
৩. ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হলে।
তবে এমন কোনো অমুসলিমকে হত্যা করা হারাম, যে ইসলামী রাষ্ট্রে আইন মান্য করে বসবাস করে বা মুসলমানদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ।
ইচ্ছাকৃতভাবে মুমিনকে হত্যা করলে তার স্থায়ী আবাস হবে জাহান্নাম। আল্লাহ বলেন—“সে সেখানে চিরকাল থাকবে, আল্লাহ তার ওপর অসন্তুষ্ট হবেন, তাকে লানত করবেন এবং কঠিন শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন।”
রাসূল (সা.) বলেন—“কিয়ামতের দিন প্রথম বিচার হবে হত্যার।” (বুখারি: ৬২৮৪) যারা নির্মমভাবে মানুষ হত্যা করে—তাদের কি মনে হয় না, একদিন তারা নিজেরাও মরবে? তারা কি মনে করে না, আল্লাহর আদালত থেকে পালাতে পারবে?
যেদিন মুখ বন্ধ করে দেওয়া হবে, সেদিন খুনির হাত ও পা সাক্ষী দেবে তার কুকর্মের বিরুদ্ধে। কোরআনে বলা হয়েছে—“আজ আমি তাদের মুখ বন্ধ করে দেব, তাদের হাত কথা বলবে, আর পা সাক্ষ্য দেবে যা তারা করত।” (ইয়াসিন, আয়াত ৬৫)
মানুষ যখন অমানুষ হয়ে যায়, তখন নীতি কথা কাজ করে না—চায় কঠিন শাস্তি। যেই হোক, যেই দলের হোক—অপরাধীকে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
প্রশাসনের উচিত প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা। মানবিকতার ডাক তুলে জনগণকে জাগতে হবে, আর গণমাধ্যমকে সত্য প্রকাশে অগ্রণী হতে হবে। তাহলেই সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে। ইনশাআল্লাহ।